উন্নয়নশীল বাংলাদেশের আগামীর কৃষি ব্যবস্থাপনা।

দেশের প্রত্যেকটি মানুষের কর্মক্ষম ও সুস্থ জীবন পরিচালনার জন্য চাহিদা ও পছন্দানুযায়ী সব সময়ে যথেষ্ট পরিমাণ নিরাপদ ও পুষ্টিসমৃদ্ধ খাবার প্রাপ্তির নিশ্চয়তা থাকাই খাদ্য নিরাপত্তার মূল বিষয়। খাদ্য নিরাপত্তায় শুধুমাত্র ভাত-প্রাপ্তির নিশ্চয়তা, তথা চাল বা ধান উৎপাদনে কোন দেশের সয়ম্ভরতা অর্জনকে না বিবেচনা করে, পুষ্টি সরবরাহকারী অন্যান্য সকল ধরনের খাদ্য প্রাপ্তির নিশ্চয়তাকেও বুঝিয়ে থাকে। বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের আটত্রিশ বৎসর পর জনসংখ্যা দ্বিগুণ হওয়া সত্বেও বর্তমানে খাদ্য ঘাটতি ২০-২৫ লাখ মেট্রিক টনই রয়ে গেছে। কৃষক, কৃষিবিদ ও কৃষিবিজ্ঞানীদের একান্ত চেষ্টার ফলে বাংলাদেশের কৃষিক্ষেত্রে এ অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে। তবে, বর্তমানে যে হারে (১.৪৮%) জনসংখ্যা বাড়ছে, তা চলতে থাকলে আগামী ২০৩০ সন নাগাদ বাংলাদেশের জনসংখ্যা ২০ কোটি ছাড়িয়ে যাবে। বর্ধিত এ জনসংখ্যার বিভিন্ন চাহিদা - ঘর-বাড়ী, রাস্তা-ঘাট ইত্যাদি মেটানোর পর খুব অল্প জমিই অবশিষ্ট থাকবে, সেই অল্প পরিমাণ জমির উৎপাদন দিয়েই সমগ্র জনগণের খাদ্যের যোগান দিতে হবে। খাদ্য নিরাপত্তা বলতে যদি দানাদার খাদ্যের নিরাপদ সংস্থানকে বুঝায়, তাহলেও বাংলাদেশ এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় যথেষ্ট সক্ষম নয়। বিশ্বের উষ্ণতা বৃদ্ধি পাওয়ায় বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, লবনাক্ততা বৃদ্ধি, অনিয়মিত ও অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত, খরা, ইত্যাদি এখন নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। পরিবেশ বিপর্যয় থেকে বাংলাদেশ তথা বিশ্বকে রক্ষা করতে হবে। ভূমিক্ষয়, ভূমির উর্বরতা সংরক্ষণ ইত্যাদি বিষয়ের ওপর গুরুত্বারোপ করতে হবে এবং বিকল্প জ্বালানির উৎস খুঁজতে হবে। আমাদের দেশে ধানের হেক্টরপ্রতি গড় ফলন মাত্র ২.৭ মেঃ টন। হাইব্রিড সহ উফশী ধানের আবাদ বৃদ্ধি এবং উন্নত প্রযুক্তি গ্রহণের মাধ্যমে হেক্টর প্রতি উৎপাদন বাড়াতে পারলে বর্ধিত জনসংখ্যার খাদ্য চাহিদা মিটিয়ে একটি স্থায়ী মজুদ গড়ে তোলা সম্ভব। মানসম্পন্ন বীজ সরবরাহের মাধ্যমে ধানের উৎপাদন কমপক্ষে ১০% বাড়ানো গেলেও বাংলাদেশের খাদ্যে সয়ম্ভরতা অর্জণ করা এখনই সম্ভব। তদুপরি গবেষণা মাঠে প্রাপ্ত ধানের ফলনের চেয়ে কৃষকের মাঠে প্রাপ্ত ফলনের পার্থক্য (ণরবষফ এধঢ়) যথাযথ চাষাবাদ ব্যবস্থাপনার সাহায্যে কমিয়ে আনার মাধ্যমেও দেশের সার্বিক খাদ্য উৎপাদন অনেকটা বাড়ানো সম্ভব। ধানের মোট উৎপাদন ও বাজারে চালের প্রাপ্যতা/সহজলভ্যতার বিষয়টি খাদ্য নিরাপত্তার প্রধান নিয়ামক হিসাবে গণ্য না করে জনগনের পুষ্টিমানের নিরাপত্তার বিষয়টিও ভাবতে হবে। ভুট্টা, শাক-সব্জী, ডাল, তৈলবীজ ও বিভিন্ন ফলের নতুন নতুন জাত উদ্ভাবন ও উন্নত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সার্বিক উৎপাদন বাড়াতে হবে। বসত বাড়ীর আশেপাশের জমিতে শাক-সব্জী ও ফল গাছের আবাদ করে দেশের সার্বিক উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব। পতিত জমিতে খেজুর এবং তাল গাছের চাষ করে জনগণের চিনি/গুড়ের চাহিদা মেটানো ছাড়াও বিদেশে রপ্তানিও করা যেতে পারে। প্রোটিন বা আমিষ সরবরাহের প্রধানতম উৎস্য মাছ, মাংশ, ডিম ও দূধের সংস্থানের জন্য উন্নত জাতের অধিক সংখ্যক মাছ, হাঁস-মুরগী, ছাগল ও গরু-মহিষ পালনের মাধ্যমে খাদ্য নিরাপত্তার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা যেতে পারে। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য মান্ধাতার আমলের কৃষি ব্যবস্থাকে আধুনিকায়নের মাধ্যমে বানিজ্যিক কৃষিতে রূপান্তর করা একান্ত কর্তব্য। সে জন্য প্রয়োজন বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানে উদ্ভাবিত ফসল চাষাবাদের উন্নত প্রযুক্তিসমূহ মাঠ পর্যায়ে কৃষকের কাছে অতি দ্রুত পৌছে দিয়ে তা ব্যবহারে কৃষকদেরকে আগ্রহী করে তোলা, টিস্যু কালচার, জিএম শস্য উৎপাদন, কৃষি পণ্যের উন্নত সংরক্ষণ ব্যবস্থা, শস্য বীমা চালু করা সহ কৃষি বিজ্ঞানীদেরকে অধিকতর সুযোগ-সুবিধাদি প্রদানের মাধ্যমে গবেষণা কাজে অধিকতর মনোযোগী করার ব্যবস্থা গ্রহণ। সকল ক্ষেত্রে উন্নত ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি সরকারী উদ্যোগ একান্ত প্রয়োজন।

খাদ্য নিরাপত্তাঃ

খাদ্য নিরাপত্তা বলতে একটি দেশ, সমাজ বা পরিবারের প্রত্যেকটি মানুষের কর্মক্ষম ও সুস্থ জীবন পরিচালনার জন্য চাহিদা ও পছন্দানুযায়ী সব সময়ে যথেষ্ট পরিমাণ নিরাপদ ও পুষ্টিসমৃদ্ধ খাবার প্রাপ্তির নিশ্চয়তা থাকাকে বুঝায় (এফএও)। সুতরাং, খাদ্য নিরাপত্তার বিষয়টি শুধুমাত্র ভাত-প্রাপ্তির নিশ্চয়তা, তথা চাল বা ধান উৎপাদনে কোনো দেশের সয়ম্ভরতা অর্জনকে না বিবেচনা করে, পুষ্টি সরবরাহকারী অন্যান্য সকল ধরনের খাদ্য প্রাপ্তির নিশ্চয়তাকেও বুঝিয়ে থাকে।

উন্নয়নশীল বাংলাদেশ - অতীত, বর্তমান ও আগামীঃ

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের সময় এর জনসংখ্যা ছিল ৭ (সাত) কোটি। আটত্রিশ বৎসর পর জনসংখ্যা দ্বিগুণে পেঁৗচেছে। ১৯৭১ সালে ২০-২৫ লাখ মেট্রিক টন খাদ্য ঘাটতি ছিল (সংবাদ, ২০০৯)। বাংলাদেশের জনসংখ্যা দ্বিগুণ হওয়া সত্বেও বর্তমানে খাদ্য ঘাটতি অনুরূপই রয়ে গেছে। কৃষক, কৃষিবিদ ও কৃষিবিজ্ঞানীদের একান্ত চেষ্টার ফলে বাংলাদেশের কৃষিক্ষেত্রে এ অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে। তবে, এতে আত্মতুষ্টির কোন সুযোগ নেই, কেননা আগামীতে পৃথিবীতে প্রতিবৎসর প্রায় ৭৩ মিলিয়ন জনসংখ্যা যোগ হবে, যা খাদ্য ঘাটতিজনিত সংকটকে আরো বাড়িয়ে দেবে। তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোই খাদ্য সংকটের শিকার হবে। বাংলাদেশ জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে অনেক সাফল্য দেখালেও বর্তমানে যে হারে (১.৪৮%) জনসংখ্যা বাড়ছে, তা চলতে থাকলে আগামী ২০৩০ সন নাগাদ বাংলাদেশের জনসংখ্যা ২০ কোটি ছাড়িয়ে যেতে পারে। বর্ধিত এ জনসংখ্যার বিভিন্ন চাহিদা - ঘর-বাড়ী, রাস্তা-ঘাট ইত্যাদি মেটানোর পর খুব অল্প জমিই অবশিষ্ট থাকবে, যা কৃষি পণ্য উৎপাদনের জন্য ব্যবহার করা যাবে। সেই অল্প পরিমাণ জমির উৎপাদন দিয়েই সমগ্র জনগণের খাদ্যের যোগান দিতে হবে। জনসংখ্যা বৃদ্ধির প্রেক্ষিতে বার্ষিক প্রায় শতকরা এক ভাগ হারে কৃষি জমি হ্রাস পাচ্ছে। আগামী দিনে বাংলাদেশকে কম পরিমাণ জমি থেকে খাদ্য সংস্থানের জন্য এক ভয়াবহ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে।
সারণী – ১: বাংলাদেশের সম্ভাব্য জনসংখ্যা, মাথাপিছু কৃষি জমি ও প্রয়োজনীয় খাদ্য চাহিদার পরিমাণ।

উপাদান

সাল

২০০০

২০১০

২০২০

২০৩০

১) জনসংখ্যা (মিলিয়ন)

১৩২.৪

১৫৩.৭

১৭৪.৮

১৯৩.৬

২) মাথাপিছু কৃষি জমির পরিমাণ (হেঃ)

০.০৬৬

০.০৬১

০.০৫৩

০.০৪৭

৩) খাদ্য চাহিদা (মিলিয়ন টন)

(ক) চাল ও গম

২৬.২৮

৩৩.৮৬

৪১.৭৪

৫০.৬২

(খ) ডাল

১.৫৯

২.২৮

৩.১২

৪.১৯

(গ) ভোজ্য তৈল

০.৫৭

০.৭৮

১.০৪

১.৩৫

(ঘ) সব্জি

৮.১৪

১১.৬৮

১৬.৬৩

২২.৬২

(ঙ) কন্দাল ফসল

২.৪৫

৩.৫৯

৫.০১

৬.৮৬

(চ) চিনি

০.৬২

১.০১

১.৬৪

২.৬৮

(ছ) ফল

১.০০

১.৭৮

৩.০৭

৫.২৩


ধান উৎপাদন বাংলাদেশের মানুষের দীর্ঘ দিনের ঐতিহ্য। খাদ্য নিরাপত্তা বলতে যদি দানাদার খাদ্যের নিরাপদ সংস্থানকে বুঝায়, তাহলেও বাংলাদেশ এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় যথেষ্ট সক্ষম নয়। বিশ্বের উষ্ণতা বৃদ্ধি পাওয়ায় বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, লবণাক্ততা বৃদ্ধি, অনিয়মিত ও অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত, খরা ইত্যাদি এখন নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। এসব কারণে বিশ্বের খাদ্য উৎপাদন দারুণভাবে ব্যাহত হচ্ছে। ফলে দেখা দিচ্ছে বিশ্বে খাদ্য সংকট। এছাড়া ক্রমবর্ধমান জ্বালানি চাহিদা মেটানোর জন্য বিশ্বের বিভিন্ন দেশ খাদ্যশস্যকে জৈব জ্বালানি উৎপাদনের জন্য ব্যবহার করছে, বিধায় বিশ্বের ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার খাদ্য নিরাপত্তার ইসু্যটি বিরাট চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে। জ্ঞান-বিজ্ঞানের এই জয়জয়কার অবস্থায় এমনটি আমরা আশা করতে পারি না। এ ব্যাপারে আমাদের এখনই সতর্ক হতে হবে। পরিবেশ বিপর্যয় থেকে বাংলাদেশ তথা বিশ্বকে রক্ষা করতে হবে। ভূমিক্ষয়, ভূমির উর্বরতা সংরক্ষণ ইত্যাদি বিষয়ের ওপর গুরুত্বারোপ করতে হবে এবং বিকল্প জ্বালানির উৎস খুঁজতে হবে।
চালকে আগামীতে এশিয়ার গণ-অসন্তোষের সম্ভাব্য কারণ হতে পারে উল্লেখ করে জানানো হয় যে, ২৫ বৎসরের মধ্যে বিশ্বব্যাপী ২০০৮ সালে চালের মজুদ সর্বনিম্ন পর্যায়ে ছিল। যেখানে চালের বিশ্ব ব্যাপী মজুদ ছিল ১৫ কোটি টন, সেখানে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৭ কোটি ৫০ লাখ টনে (নয়া দিগন্ত, ২০০৮)।
আমাদের দেশে ধানের হেক্টরপ্রতি গড় ফলন মাত্র ২.৭ মেঃ টন। কিন্তু থাইল্যান্ড ও জাপানে হেক্টর প্রতি গড় ফলন ৫-৭ মেঃ টন (জনকন্ঠ, ২০০৮)। আমাদের মাটি ধান চাষাবাদের উপযোগী হলেও উৎপাদনের দিক থেকে আমরা ধান উৎপাদনকারী অন্যান্য দেশ থেকে পিছিয়ে আছি। আমরা যদি হাইব্রিড সহ উফশী ধানের আবাদ বৃদ্ধি এবং উন্নত প্রযুক্তি গ্রহণের মাধ্যমে হেক্টর প্রতি উৎপাদন বাড়াতে পারি তাহলে বর্ধিত জনসংখ্যার খাদ্য চাহিদা মিটিয়ে একটি স্থায়ী মজুদ গড়ে তোলা সম্ভব (যুগান্তর, ২০০৮)।
কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে মানসম্পন্ন বীজ ছাড়া খাদ্য নিরাপত্তা অর্জন করা সম্ভব নয় (সংবাদ, ২০০৯)। বাংলাদেশে আবাদকৃত মোট ১০.৮২ মিলিয়ন হেক্টর ধানী জমিতে ব্যবহারের জন্য প্রয়োজনীয় মোট বীজের মাত্র ১৮% সরকারী ও বেসরকারী বীজ উৎপাদনকারীদের উৎপাদিত মানসম্পন্ন বীজের মাধ্যমে মিটানো সম্ভব হচ্ছে (গরধ, ২০০৫)। বাকী ৮২% বীজের প্রয়োজন মিটানো হয় চাষীদের গতানুগতিকভাবে উৎপাদিত ও সংরক্ষিত নিম্নমানের বীজের দ্বারা। মানসম্পন্ন বীজ সরবরাহের মাধ্যমে ধানের উৎপাদন কমপক্ষে ১০% বাড়ানো গেলেও বাংলাদেশের খাদ্যে সয়ম্ভরতা অর্জন করা এখনই সম্ভব। পরিপূর্ণ খাদ্য নিরাপত্তা অর্জন করার জন্য কৃষকের দোরগোড়ায় মানসম্মত বীজ সরবরাহ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
বোরো মৌসুমে ধানের চারার বয়স ৪৫ দিনের বেশী হলে প্রতি দিন বেশী বয়সের জন্য প্রতি হেক্টরে ২০-২৫ কেজি হারে ফলন কম হতে পারে। এ সময়ে ধানের চারা রোপনের আদর্শ সময় হলো ১৫ই ডিসেম্বর থেকে ১৫ই জানুয়ারী (পৌষ মাস), তবে ৩১শে জানুয়ারীর পর প্রতিদিন বিলম্বে চারা রোপনের জন্য হেক্টর প্রতি ৫০-৬০ কেজি ধান কম হতে পারে। সে কারনে কম দূর্যোগপূর্ণ রৌদ্রকরোজ্জ্বল বোরো মৌসুমে সঠিক বয়সের ধানের চারা সঠিক সময়ে রোপন করে উপযুক্ত পরিচর্যা ও সুষম সার ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে প্রচলিত উফশী ধানের ফলন সহজেই হেক্টর প্রতি কমপক্ষে এক টন বৃদ্ধি করা সম্ভব। গবেষণা মাঠে প্রাপ্ত ধানের ফলনের চেয়ে কৃষকের মাঠে প্রাপ্ত ফলনের পার্থক্য (ণরবষফ এধঢ়) যথাযথ চাষাবাদ ব্যবস্থাপনার সাহায্যে কমিয়ে আনার মাধ্যমেও দেশের সার্বিক খাদ্য উৎপাদন অনেকটা বাড়ানো সম্ভব।
ধান বাংলাদেশের প্রধান খাদ্যশস্য। প্রায় ৭০% জমিতে ধান চাষ করা হয়। ধানের মোট উৎপাদন ও বাজারে চালের প্রাপ্যতা/সহজলভ্যতার বিষয়টি খাদ্য নিরাপত্তার প্রধান নিয়ামক হিসাবে গণ্য করা হয়। তবে, খাদ্য নিরাপত্তার সাথে জনগনের পুষ্টিমানের নিরাপত্তার বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত। কারণ শুধু বেঁচে থাকলে চলবে না। সুস্থ ও কর্মক্ষম থাকতে হবে। সুস্থ ও কর্মক্ষম থাকার জন্য অত্যন্ত জরুরী উপাদান সমূহের মধ্যে বিভিন্ন ভিটামিন ও মিনারেলের প্রধানতম উৎস্য হল শাক-সব্জী, যা প্রতিদিনের খাদ্য তালিকায় ভাতের সাথে একান্তই অপরিহার্য। মাথাপিছু দৈনিক ২২০ গ্রাম শাক-সব্জী খাওয়ার প্রয়োজন হলেও বাংলাদেশে মাথাপিছু দৈনিক প্রাপ্যতা মাত্র ৬০ গ্রাম। সে কারণে, শাক-সব্জীর নতুন নতুন জাত উদ্ভাবন ও সার্বিক উৎপাদন বাড়ানোর জন্য গবেষণা কার্যক্রম জোড়দার করা সহ মাঠ পর্যায়ে চাষীদের উদ্ভূদ্ধকরণ ও সার্বিক সহযোগীতা দান করতে হবে।
বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির প্রভাবে বাংলাদেশে শীত কালের দৈর্ঘ্য কমে যাওয়ায় গমের আবাদী এলাকা ও ফলন দুইই কমে যাচ্ছে। সে কারণে বৎসরের বিভিন্ন সময়ে সহজে চাষাবাদ ও বিভিন্ন কাজে ব্যবহার যোগ্য অধিক ফলনশীল দানা ফসল ভুট্টার আবাদ বাড়ানোর ব্যবস্থা নেয়া জরুরী। মানুষের খাদ্য ছাড়াও ভূট্টা হাস-মুরগী ও পশু খাদ্য হিসাবেও ব্যবহার করা যায়।
আমিষ সরবরাহের ক্ষেত্রে ডালের বিকল্প নেই। ডাল ফসলের উন্নত এবং রোগ-পোকামাকড় প্রতিরোধক্ষম জাত উদ্ভাবন ও আবাদী এলাকা বৃদ্ধির মাধ্যমে ডালের উৎপাদন বৃদ্ধির ব্যবস্থা নিতে হবে।
স্নেহ/তৈল জাতীয় খাদ্যের সরবরাহের নিশ্চয়তা বিধানের লক্ষ্যে তৈলবীজ জাতীয় ফসলের উন্নত ও রোগ-পোকামাকড় প্রতিরোধক্ষম জাতের আবাদ ও উন্নত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ফলন বৃদ্ধির ব্যবস্থা নিতে হবে।
পুষ্টিমানের দিক দিয়ে ফলের গুরুত্ব অপরিসীম। মাথাপিছু দৈনিক ৮৫ গ্রাম ফল খাওয়ার প্রয়োজন হলেও আমাদের দেশে মাত্র ৩৫ গ্রাম ফল পাওয়া যায়। বিভিন্ন ফল গাছের নতুন নতুন উচ্চ ফলনদানকারী মাতৃগাছ সৃষ্টি, ফল গাছের নতুন বাগান সৃষ্টি ও পুরনো বাগানের ফল গাছের যথাযথ পরিচর্যা, রোগ পোকা-মাকড় দমনের মাধ্যমে ফলের উৎপাদন বাড়ানোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
সুস্থ ও কর্মক্ষম থাকার জন্য মিষ্টি জাতীয় খাদ্যদ্রব্যের (শর্করা) গুরুত্ব অনেক। এটা মানুষকে তাৎক্ষনিকভাবে শক্তি যোগায়। জাতীয় পুষ্টিমান চিনি ও গুড় ব্যবহারের ওপর বহুলাংশে নির্ভরশীল। বাংলাদেশে মিষ্টি জাতীয় খাদ্যদ্রব্যের প্রধান উৎস চিনি ও গুড়। সুস্থ এবং কর্মক্ষম থাকার জন্য একজন পূর্ণবয়স্ক ব্যক্তির বছরে প্রায় ১৩ কেজি চিনি/গুড় খাওয়া দরকার, অথচ বাংলাদেশে বার্ষিক মাথাপিছু চিনি/গুড় গ্রহনের হার মাত্র ৬ কেজি। জনসংখ্যার উত্তরোত্তর বৃদ্ধির ফলে চিনি/গুড়ের বাড়তি চাহিদা মেটানোর জন্য যেহেতু বর্তমান বাস্তবতায় আখের জন্য নতুন জমি বরাদ্দ করা প্রায় অসম্ভব, সেহেতু আমাদের বিকল্প উৎস হিসেবে রাস্তার পাশ্বর্ের পতিত জমি, বেড়িবাধ, রেল লাইনের দুই পাশে, পুকুর পাড়ে, বাড়ির আশেপাশে পতিত জমি এবং জমির আইলে খেজুর এবং তাল চাষ করে জনগণের চিনি/গুড়ের চাহিদা মেটানো ছাড়াও বিদেশে রপ্তানিও করা যেতে পারে।
আমাদের দৈনন্দিন খাদ্য চাহিদার ৫৩% আমরা পাই দানাদার খাদ্য হতে, যা দৈনিক ২১২২ কিলো-ক্যালরীর ৭৫% যোগান দেয়। বাকি ২৫% কিলো-ক্যালরী খাবারের উৎস ফলমূল, শাক-সব্জী ও ডাল-তৈল। প্রতিদিন আমাদের ৮৫ গ্রাম ফল এবং আলুসহ অন্যান্য শাক-সব্জী খাওয়া প্রয়োজন কমপক্ষে ২০০ গ্রাম, আমরা খাই গড়ে ২৭ গ্রাম ফল এবং আলু সহ শাক-সব্জী - ১১০ গ্রামের মত, যার মধ্যে আলুই প্রায় ৭০ গ্রাম। আমাদের দৈনিক খাদ্য তালিকায় ফল ও শাক-সব্জী প্রয়োজনের তুলনায় খুবই কম। এর প্রধান কারণ কম উৎপাদন। তাছাড়া, ফল-মূল এবং শাক-সব্জীর পুষ্টিমান ও সুষম খাদ্যে এগুলোর প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে সচেনততার অভাব। প্রধান প্রধান ফসলের চাপে শাক-সব্জী ও ফল-মূলের আবাদী জমিও বাড়ানো যাচ্ছে না। কিন্তু আবাদ বাড়াতে হবে। আমাদের আছে ১ কোটি ১৮ লক্ষ বসতভিটা। বসতভিটার ক্ষুদ্র এক খন্ড খালি জায়গায় পরিকল্পিত উপায়ে শীতের সময় চাষ করা সম্ভব লাল শাক, মূলা শাক, পুঁই শাক, টমেটো, ঢেঁড়স ইত্যাদি। খুবই সম্ভব ঘরের চালে, বেড়ায়, ছোট মাচায় ১/২ টি লাউ, শিম, করলার গাছ লাগানো। অনুরূপভাবে বর্ষায় সম্ভব বেগুন, পালং, গীমাকলমী ইত্যদির ছোট বাগান করা এবং চালে, বেড়ায়, ফলের গাছে ও মাচায় চাল কুমড়া, ঝিঙ্গা, চিচিঙ্গার ২/৪টি গাছ লাগানো। এসব শাক-সব্জির পাশাপাশি প্রতিটি বাড়িতেই পরিকল্পিতভাবে ২/১টি পেঁপে, লেবু, আম, কাঁঠাল, পেয়ারা ইত্যাদি ফলের গাছও লাগানো সম্ভব। কাজে লাগে এমন ২/৪টি ওষুধি গাছ লাগানোও সম্ভব।
প্রোটিন বা আমিষ সরবরাহের প্রধানতম উৎস্য মাছ, মাংশ, ডিম ও দূধের সংস্থান করাও খাদ্য নিরাপত্তার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। দেশের সকল হাজামজা পুকুর-নালা, খাল-বিল, হাওড়-বাওড় এর সংস্কার করে সেচের পানির সংস্থানের সাথে সাথে পরিকল্পিতভাবে উন্নত প্রজাতির মাছ চাষাবাদের মাধ্যমে অধিক পরিমান মাছ উৎপাদনের ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন। গ্রামের প্রান্তিক চাষী ও দরিদ্র জনগণের মধ্যে হাঁস-মুরগী ও ছাগল পালনের আগ্রহ রয়েছে। তাদেরকে উপযুক্ত বুদ্ধি-পরামর্শ দিয়ে, প্রয়োজনীয় স্বল্প পুঁজি সরবরাহের মাধ্যমে অধিক সংখ্যক উন্নত প্রজাতির হাঁস-মুরগী ও ছাগল পালনের ব্যবস্থা নেয়া গেলে অধিক পরিমান মাংশ, ডিম ও দুধ সরবরাহের মাধ্যমে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব। পোল্ট্রি ফার্মে হাঁস-মুরগীর মড়ক নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে যথাসময়ে বিশেষ পদক্ষেপ নিতে হবে, এ বিষয়ে সঠিক সময়ে সরকারী উদ্যোগ অত্যন্ত সুফলদায়ী হতে পারে। ডেয়ারী খামারের উন্নত ব্যবস্থাপনা, নতুন নতুন ডেয়ারী খামার প্রতিষ্ঠা করা, সহজ শর্তে ঋণ প্রদানের ব্যবস্থা গ্রহণ, উন্নত ব্যবস্থাপনায় ঘাস উৎপাদন, সংগ্রহ ও সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা, আখের ছোবড়া ও ভূট্টার গাছ ইত্যাদি জ্বালানী হিসাবে ব্যবহারের পরিবর্তে প্রক্রিয়াজাত করে সাইলেজ জাতীয় উন্নত পশু-খাদ্য সস্তায় সরবরাহ নিশ্চিত করার মাধ্যমে অধিক সংখ্যক গরু-মহিষ পালন এবং মাংশ ও দুধের অধিক যোগান নিশ্চিত হতে পারে।

পরিবর্তিত পৃথিবীঃ গ্লোবাল ওয়ার্মিং ও অন্যান্য পরিবেশজনিত কারণে সৃষ্ট দূর্যোগে করনীয়ঃ

পরিবেশ বিজ্ঞানী ও আবহাওয়াবিদগণের ধারনামতে বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি থেকে গ্রীণ হাউস গ্যাসের প্রভাবে সারা পৃথিবী ব্যাপী তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে সমুদ্রপৃষ্টের উচ্চতা বৃদ্ধি সহ পারিপার্শ্বিক তাপমাত্রা ও আদ্রতা বৃদ্ধি, অসময়ে/অধিক বৃষ্টিপাত, ঘনঘন বন্যা, খরা ইত্যাদি প্রকৃতিক দূর্যোগে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হওয়া সহ উপকূলীয় এলাকায় লবনাক্ত পানি অনুপ্রবেশের কারনে মাটির লবনাক্ততা বেড়ে গিয়ে বহু জমি ফসল আবাদের অনুপযুক্ত হয়ে পড়ছে।
বর্তমানে দেশের উপকূলীয় এলাকায় ১০ লাখ হেক্টর জমি লবনাক্ততার কারণে ফসল চাষের অনুপযুক্ত, আগামীতে এর পরিমান আরো বাড়ার সম্ভাবনা। ইতিমধ্যে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট ব্রিধান৪৭ জাতের ধান উদ্ভাবন করেছে, যা লবনাক্ততা সহিষ্ণু (যায়যায়দিন, ২০০৮)।
চিংড়ি চাষ বৈদেশিক মূদ্রা অর্জণকারী অত্যন্ত লাভজনক ব্যবসা হলেও অপরিকল্পিতভাবে চিংড়ি চাষের কারনে এক সময়ের শস্যভান্ডার হিসাবে খ্যাত দেশের দক্ষিন-পশ্চিমাঞ্চলের পরিবেশ বিপন্ন হওয়া সহ লবনাক্ততার কারনে ফসলী জমি চাষ অযোগ্য হয়ে পড়ায় সে সকল এলাকায় দারুনভাবে খাদ্য ঘাটতি দেখা দিয়েছে। চিংড়ি চাষের সুষ্ঠ নীতিমালা প্রণয়ন করতঃ পরিকল্পিতভাবে পরিবেশবান্ধব চিংড়ি চাষের মাধ্যমে অধিক চিংড়ি উৎপাদন ও ফসল চাষের জমি সংরক্ষণের মাধ্যমে খাদ্যে সয়ম্ভরতা অর্জণে অবদান রাখা সম্ভব।
ঠান্ডা ও শুস্ক আবহাওয়া শাক-সব্জী উৎপাদনের জন্য উপযুক্ত বিধায় আমাদের দেশে শীতকালে বেশিরভাগ শাক-সব্জীর চাষ করা হয়। কিন্তু, শীতকালীন শাক-সব্জীর জন্য অনুকুল ঠান্ডা ও শুস্ক আবহাওয়ার ব্যাপ্তি কমে যাওয়ায় গাছের বাড়বাড়তি ও প্রজনন পর্যায়ে যথাযথ পরিবৃদ্ধির অভাবে শীতকালীন শাক-সব্জীর ফলন মারাত্মকভাবে কমে যাচ্ছে, উচ্চ তাপমাত্রা বিভিন্ন সব্জীর ফুল ও ফল সৃষ্টিতে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে, ফুলের পরাগ শুকিয়ে যায, স্ত্রী কেশরে পরাগ গজানো বিঘি্নত হওয়ার ফলে গাছে ফলের সংখ্যা কমে গিয়ে ফলনও অনেক কমে যায়, ফুল কপির ফুল তৈরী ও বাঁধাকপির হেড বাঁধতে পারেনা। ঠিক মত ফুল ফোঁটা ও পড তৈরী হতে না পারায় গাছের বীজ উৎপাদনও অনেক কমে যেতে পারে। ২০ ডিগ্রী সেন্টিগ্রেডের চেয়ে বেশী তাপমাত্রায় আলুর টিউবার তৈরী কমে যাওয়ায় ফলন কমে যায়। অতিরিক্ত বৃষ্টি পাতের জন্য বাতাসের আদ্রতা বৃদ্ধি পাওয়ায় রোগ-পোকামাকড়ের আক্রমন বৃদ্ধি পেয়ে ফসলের মান ও সার্বিক ফলনও অনেক কমে যায়। ৪ ডিএস/মিটার লবনাক্ততা বিশিষ্ট জমিতে শাক-সব্জীর বাড়বাড়তি ও ফলন মারাত্মকভাবে বিঘি্নত হয়। বৈশ্বি্যক তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারনে শীতকালের ব্যপ্তি কমে যাওয়ার কারনে গরম কালে, অধিক বৃষ্টিপাত ও আদ্রতায় উৎপাদন যোগ্য, রোগ-পোকা মাকড় প্রতিরোধ ক্ষমতা সম্পন্ন, লবনাক্ততা সহ্য ক্ষমতা বিশিষ্ট শাক-সব্জীর জাত উদ্ভাবন ও চাষাবাদের ব্যবস্থা নেয়ার মাধ্যমে জনগণের পুষ্টির চাহিদা মিটানোর নিশ্চয়তা বিধান করতে হবে।
গ্রীণহাউস গ্যাসের প্রভাবে সারা পৃথিবী ব্যাপী তাপমাত্রা বৃদ্ধি, তথা গ্লোবাল ওয়ার্মিং এর কারণে আগামী একশত বছরে সমুদ্রপৃষ্টের উচ্চতা ৫০ থেকে ২০০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এ মাত্রা কমবেশী না হয়ে যদি সমুদ্রপৃষ্টের উচ্চতা ১০০ সেন্টিমিটার বা এক মিটারও বৃদ্ধি পায়, তা হলে বিজ্ঞানীগণের ধারনা মতে বাংলাদেশের অভ্যন্তরের ১৭ থেকে ২০ শতাংশ জমি পানিতে ডুবে গিয়ে ফসল আবাদের অনুপযুক্ত হয়ে পড়বে (ভট্টাচার্য, ২০০৯)। কিন্ত, বঙ্গেয় বদ্বীপ একটা জীবন্ত ভূমি। বিভিন্ন গবেষণামতে দেখা যায় যে, একদিকে (ক) নানাবিধ ভূ-প্রাকৃতিক কারনে বাংলাদেশের ভূমির ক্রমাগত নিচে নেমে যাওয়া বা অবনয়নের জন্য ভূপৃষ্টের উচ্চতা কমে যাওয়ার হার বেড়ে গেলেও, অন্যদিকে (খ) দেশের অভ্যন্তরের বিভিন্ন নদ-নদীর মাধ্যমে বর্ষাকালে উত্তর থেকে বাহিত পলিভরণের দ্বারা প্রতি নিয়তই নদী অববাহিকা সহ উপকূলীয় অঞ্চলের জমির উচ্চতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। সেক্ষেত্রে, এখনই আতঙ্কিত না হয়ে, সমূদ্রপৃষ্টের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে আসলেই কত পরিমাণ জমি তলিয়ে যাবে তা' দীর্ঘ মেয়াদী সুক্ষ্ম গবেষণাকর্মের মাধ্যমে, যদিও খুব সহজ সাধ্য কাজ নয়, নির্ধারণ করে সে মোতাবেক দীর্ঘ মেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণ করা প্রয়োজন।

খাদ্য নিরাপত্তায় সরকারী ভূমিকাঃ

সংসদে খাদ্যমন্ত্রীর বক্তব্যের বরাতে পত্রিকার উল্লেখ মতে, সরকার চলতি বছর ৮ (আট) লাখ মেট্রিক টন গম ও ৫ (পাঁচ) লাখ মেট্রিক টন চাল আমদানীর পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। চলতি ২০০৮-২০০৯ ইং অর্থবছরে খাদ্যশস্য উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৩ কোটি ৪৩ লাখ মেট্রিক টন, তার মধ্যে আউশ ২৩.১২ লাখ মেঃ টন, আমন ১৩০ লাখ মেঃ টন এবং বোরো ১৮০ লাখ মেঃ টন, গম ১০ লাখ মেঃ টন। এছাড়া ১৩.৭৫ লাখ মেঃ টন ভূট্টা উৎপাদনের লক্ষ্য মাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে বলেও সংসদে জানানো হয়। মন্ত্রীর বক্তব্যমতে দেশের দরিদ্র জনগণকে খাদ্য সহায়তা দানের জন্য কাজের বিনিময়ে খাদ্য কর্মসূচীর আওতায় ২ লাখ ৭৫ হাজার মেঃ টন চাল ও ১ লাখ মেঃ টন গম বরাদ্দ দিয়েছে (মুক্ত খবর, ২০০৯)। সারের ব্যবহার বাড়ানোর জন্য সারের মূল্যে ভর্তুকী দেয়া, ডিজেলের মূল্য কমানো ও বিদ্যুৎ সরবরাহের মাধ্যমে সঠিক সময়ে সেচ সরবরাহ নিশ্চিত করা, ইত্যাদির মাধ্যমে ধানের ফলন বৃদ্ধি করার ব্যবস্থা গ্রহণের সাথে সাথে আপতকালে গ্রামীন প্রান্তিক জনগোষ্ঠির হাতে খাদ্য পেঁৗছানোর বর্তমান সরকারের গৃহীত পদক্ষেপসমূহ যথাযথ বাস্তবায়িত হলে দেশের জনগণের খাদ্য নিরাপত্তা রক্ষার ক্ষেত্রে তা' সুষ্পষ্ট অবদান রাখতে পারবে।

আগামীর কৃষি ব্যবস্থাপনাঃ

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য মান্ধাতার আমলের কৃষি ব্যবস্থাকে আধুনিকায়নের মাধ্যমে বানিজ্যিক কৃষিতে রূপান্তর করা একান্ত কর্তব্য। সে জন্য সকল মহলের সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে কৃষি ব্যবস্থায় দরকার আমূল পরিবর্তণ। প্রয়োজন বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানে উদ্ভাবিত ফসল চাষাবাদের উন্নত প্রযুক্তিসমূহ সমপ্রসারণবিদ, সমপ্রসারণকর্মী, ইলেক্ট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়ার মাধ্যমে মাঠ পর্যায়ে কৃষকের কাছে সঠিকভাবে অতি দ্রুত পৌছে দিয়ে তা ব্যবহারে কৃষকদেরকে আগ্রহী ও অভ্যস্ত করে তোলা, কৃষিতে অধিক পরিমাণ বিনিয়োগ, শস্যের অঞ্চলভিত্তিক উফশী জাত উদ্ভাবন ও চাষের ব্যবস্থা গ্রহণ, অধিক উৎপাদন এলাকা থেকে কম উৎপাদন এলাকায় সহজে ও দ্রুত খাদ্য পরিবহনের ব্যবস্থা গ্রহণ, পুনঃগবেষণার মাধ্যমে শস্য পর্যায়ক্রমের পূনর্বিণ্যাস ও শস্য-বহুমূখীকরণ, বিরূপ আবহাওয়ায় উৎপাদনক্ষম শাক-সব্জীর নতুন নতুন উফশী জাত উদ্ভাবন এবং গ্রীণ হাউস/নেট হাউস স্থাপনের মাধ্যমে বিরূপ পরিবেশ/আবহাওয়ায় প্রচলিত উফশী শাক-সব্জী চাষবাদের ব্যবস্থা গ্রহণ, টিস্যু কালচার, জিএম শস্য উৎপাদন, কৃষিভিত্তিক শিল্প স্থাপন, কৃষি পণ্যের উন্নত সংরক্ষণ ব্যবস্থা, শস্য বীমা চালু করণ, কৃষি বাজার গঠন, অমৎড়-ঈষরহরপং গঠন ও পরিচালণা, কৃষিজমি অন্যখাতে স্থানান্তর রোধের জন্য সরকারীভাবে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া, কৃষি গবেষণা কাজে নিয়োজিত বিজ্ঞানীদের কাজকে শুধুমাত্র চাকুরী হিসাবে গণ্য না করে তাদেরকে অধিকতর সুযোগ-সুবিধা প্রদানের মাধ্যমে পেশাজীবী মানসিকতা সৃষ্টির ব্যবস্থা গ্রহণ।
সারা বিশ্বে উষ্ণতা বৃদ্ধিকারক গ্যাসের পরিমান কমাতে আমাদের চেষ্টা করতে হবে। পাশাপাশি জৈব সার ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে মাটির উবর্্বরতা সুরক্ষা, প্রাকৃতিক দূর্যোগ মোকাবিলায় কৌশলী হওয়া, সঠিক সার ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা এবং লাগসই কৃষি প্রযুক্তি উদ্ভাবন সংক্রান্ত গবেষণা অব্যাহত রাখতে হবে। সকল ক্ষেত্রে উন্নত ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি সরকারী উদ্যোগ একান্ত প্রয়োজন।

লেখক: মীর মোঃ মুনিরুজ্জামান, প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা
মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিভাগ (প্রেষণে - খামার ব্যবস্থাপনা বিভাগ) বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট, গাজীপূর-১৭০১, বাংলাদেশ

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url




sr7themes.eu.org